নারীকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি বদলান
নারীকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি
বদলান
হেসে হেসে কথা বলার মানে
এই নয়, মেয়েটি আপনার প্রেমে পড়ে গেছে! একজন নারী, একজন মানুষও। পুরুষের মতো তারও আছে
নিজের মতো চিন্তা করার অধিকার, নিজের জীবন নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার, নিজের চিন্তাকে
প্রকাশ করার অধিকার। তবে গোল বাধে যখন নারী নিজেকে মানুষ হিসেবে প্রকাশ করে। সমাজের
ধরাবাঁধা কিছু চিন্তা পাশাপাশি নারীকে হেয় করার মানসিকতা নিয়ন্ত্রণ করতে চায় নারীর
জীবন।
একজন প্রাপ্ত বয়স্ক পুরুষের
প্রতিটি নারী সম্পর্কে তার প্রতিটি কাজকে ইচ্ছা মতো ব্যাখ্যা করার কোনো অবকাশ নেই।
একজন পুরুষ যেমন কাজের প্রয়োজনে বা উৎসব উৎযাপনে ঘর থেকে বের হয়, একজন নারীর ক্ষেত্রেও
তাই।
১। সুন্দর করে কথা বলার
অর্থ আমন্ত্রণ নয়: পথে চলতে গিয়ে দেখা হওয়া বা সহকর্মী কোনো নারী যদি নিজে থেকে কথা
বলে, কোনো তথ্য দিয়ে সহায়তা করে অথবা হাসিমুখে পরিচিত হয় তার মানে এই নয় সে দুর্বলতা
অনুভব করছে অথবা কোনো রকমের আমন্ত্রণ জানাচ্ছে। এটা শুধুই একটা ভদ্রতা যা প্রতিটা মানুষ
একে অন্যের সঙ্গে করা উচিত। এ থেকে কোনো সিদ্ধান্তে এসে শুধু শুধু ওই নারীকে বিরক্ত
করা খুবই নিচু মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ। এই অতি সাধারণ ঘটনাকে অন্যভাবে ব্যাক্ষা করলে
শুধুই নিজের হীন মানসিকতা প্রকাশ পায় আর কিছু নয়।
২। অভদ্রতা না করা কোনো
মহান কাজ নয়: অনেক পুরুষই ভাবেন যেহেতু তিনি কোনো নারীকে হেয় করছেন না, খারাপ ব্যবহার
করছে না অথবা যৌন নির্যাতন করছেন না তাই তিনি অনেক মহান। কেউ কেউ তো এটা বলে জাহির
করতে বেশ ভালোবাসেন, পাশাপাশি আশা করে বসেন অন্যরাও এটা নিয়ে বাহবা দিবে। কাউকে বিরক্ত
না করা, ছোট না করা এবং অবশ্যই নির্যাতন না করা কোনো মহান বিষয় নয়। এটা একটা স্বাভাবিক
ঘটনা এবং কিছু সংখ্যক অভদ্র মানুষ ছাড়া এটাই সবাই করে। তাই এর জন্য একটা মেডেল আশা
করে বসা পাগলামি ছাড়া আর কিছুই নয়।
৩। ভদ্রভাবে নাকচ করার
মানে মৌন সম্মতি নয়: ঐতিহ্যগত ভাবে ভাবা হয় নারীরা লাজুক এবং তারা মনের কথা খুলে বলতে
লজ্জা পায়। তাই কিছু জিজ্ঞেস করা হলে তারা প্রথমে না বলে। এই না’য়ের অর্থ আসলে হ্যাঁ
যা আরেকবার জিজ্ঞেস করলেই সে বলবে। তাই ‘না’ শোনার পরেও নারীদের ক্রমাগত প্রস্তাব পেয়েই
যেতে হয়। কেউ কেউ আবার এটাই ভেবে নেন যে, না বলার অধিকারটাই নারীর নেই। প্রতিটা প্রাপ্ত
বয়স্ক পুরুষের জানা উচিত নারীরা যখন না বলে তখন তার অর্থ অবশ্যই না। ভদ্রভাবে তা মেনে
সরে যাওয়া উচিত। হতে পারে পরে এই ভদ্রতার জন্যই নারীটি মত বদলাবেন।
৪। যৌন নিপীড়ন নারীর দোষ
নয়: যখনই কোনো নারী যৌন নিপীড়নের শিকার হন তখন সমাজ যে কোনো ভাবে নারীর মধ্যেই দোষ
খুঁজে পায়। এমনকি নিতান্ত কোনো শিশু কন্যা হলেও তার দোষ খোঁজায় কেউ পিছপা হয় না। তবে
অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নারীরা যৌন নিপীড়নের শিকার হয় কারণ তারা সমাজে তুলনামূলক দুর্বল
অবস্থানে থাকে। এমনকি নিপীড়নের শিকার হলেও তারা প্রতিবাদ করতে বা বা জানাতেও পারে না।
এই অবস্থার সুযোগ নিয়ে নারীকে দোষারোপ করা ঠিক নয়।
৫। বুদ্ধিমান হওয়ার জন্য
পুরুষ হওয়া জরুরী না: লিঙ্গ বৈষম্য এবং পিতৃতান্ত্রিক সমাজে পুত্র সন্তানকে বেশি গুরুত্ব
দেওয়া হত। ফলে লেখাপড়ার ক্ষেত্রেও পুরুষরা নারীদের থেকে এগিয়ে ছিল। তাই বলে নারীরা
যে কম বুদ্ধিমান বা তারা কম মেধাবী সেটা ঠিক নয়। বর্তমানে কর্মক্ষেত্রে, শিক্ষাক্ষেত্রে
এবং অন্য সকল ক্ষেত্রে নারীরা পুরুষের সমান দক্ষতা ও পরিশ্রমের ভিত্তিতে সাফল্য অর্জন
করছে। শুধুমাত্র একজন মানুষ নারী বলে কোনো কাজে তাকে অযোগ্য ভাবা মানসিক দীনতা ছাড়া
আর কিছুই নয়।,
৬। শুধু অন্যের সেবার
জন্যে নারীর জন্ম হয়নি: বিশেষজ্ঞদের মতে নারীরা ঘরের কাজ এবং অন্যের যত্ন নেওয়ার কাজ
পুরুষদের তুলনায় বেশি করেন, তার কারণ মোটেও এটা নয় যে নারীরা প্রাকৃতিক ভাবে এই ধরণের
কাজ করার জন্য উপযোগী। নারীর এ ধরণের কাজ করেন কারণ ছোটবেলা থেকে তাদের এইসব কাজের
জন্যই মানসিক ভাবে তৈরি করা হয়। তবে নারী যদি একই দক্ষতায় বাইরের কাজও করতে পারে
তবে পুরুষদেরও উচিত ঘরের কাজে নারীদের সাহায্য করা।
৭। নারীর নিজের দেহ এবং
মনের মালিক সে নিজেই: একজন নারী কখন সন্তান ধারণ করবে, কার সঙ্গে বসবাস করবে, কার সঙ্গে
শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করবে এইসব সিদ্ধান্তের অধিকার সে নিজে নেবে। পরিবার, বন্ধু,
দেশ— এ বিষয়ে নাক গলানোর অধিকার রাখে না। বিভিন্ন সময়ে চাকুরি ক্ষেত্রে মাতৃত্ব বিষয়ক
সিদ্ধান্তে হস্তক্ষেপ করা হয়। কেউ কেউ এইসব অনধিকার চর্চায় বলি হয়ে চাকুরি ছাড়তেও বাধ্য
হন। সুনির্দিষ্ট আইন থাকুক কি নাই থাকুক। এটি একটি ব্যক্তি স্বাধীনতার আওতাধীন বিষয়
এবং এই বিষয়ে অবশ্যই অন্য কারও মতামত দেওয়া উচিত নয়।
৮। সম্মান বিষয়টি এক তরফা
নয়: ঐতিহাসিক ভাবে নারীদের দাবিয়ে রাখা হত তারা দুর্বল এবং যে কোনো কাজ তারা করতে পারে
না। কিন্তু কাজের ক্ষেত্রে কয়েক শতক ধরে নারীরা প্রমাণ করে এসেছে তারা তো দুর্বল নই
বরং তারা কিছু কিছু ক্ষেত্রে পুরুষদের চেয়েও অনেক বেশি যোগ্য। তবে নারী যতই এগিয়ে আসুক
সম্মান দেওয়ার ক্ষেত্রে নারীকে এখনও সবাই একরকমের উদার নয়। অনেকেরই নারীদের বিষয়ে একটা
মানসিকতা আগেই ঠিক করা থাকে। মনোবিজ্ঞানীরা বলেন যখন নারীও একই পরিবেশে একই যোগ্যতায়
কাজ করেন তখন এসব মানসিকতাতে তারা পীড়িত বোধ করেন না। বরং তারাও একই ভাবে এই ব্যবহারকে
প্রত্যাখ্যান করে।
৯। নারীবাদের উদ্দেশ্য পুরুষদের হেয় করা নয়: নারীদের অগ্রগতি এবং সম অধিকারের পথে একটি অন্যতম বাধা হচ্ছে নারীবাদের সঙ্গে সমাজে পুরুষদের হেয় করার চিন্তা গুলিয়ে ফেলা। নারীবাদ কখনও পুরুষকে হেয় করে না। যখন একজন পুরুষ গভীর রাতে কোনো উদ্যানে কাটিয়ে দেয় তার কখনও ভাবতে হয় না তার শারীরিক গঠন কীরূপ অথবা এর জন্য তাকে কোনো সমস্যায় পড়তে হতে পারে। অথচ একজন নারীকে খুব নিরাপদ একটি স্থানে বসেও ভাবতে হয় যে তিনি একজন নারী তার শারীরিক গঠনের কারণে নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়তে পারে। নারীবাদ নারীকে এই সব অনিরাপদ বোধ থেকে মুক্তি দেওয়ার জন্য। পুরুষদের সঙ্গে যুদ্ধ করার জন্য নয়।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন