অর্থ ও নারী বিষয়ে যে কৌতুক করা উচিত নয় পুরুষদের

অর্থ ও নারী বিষয়ে যে কৌতুক করা উচিত নয় পুরুষদের

নারীরা কিভাবে অর্থ খরচ করেন বা স্বামীর পয়সা নষ্ট করেন, তা নিয়ে অনেকে কৌতুক করেন। এ বিষয়টা কতটা স্থূল বা সিরিয়াস হতে পারে তা নিয়ে লিখেছেন বিশেষজ্ঞ ভ্যানেসা ম্যাগ্রাডি।

তিনি লিখেছেন, সম্প্রতি আমি সমাজের উঁচু স্তরের মানুষদের অনুষ্ঠানে গিয়েছিলাম। এই মানুষ গুলোর চেহারা সবার চেনা। রাস্তায় বেরোলে সবাই তাদের দিতে তাকিয়ে থাকেন। তারা ম্যাগাজিনের কাভারে আসেন। ওই অনুষ্ঠানে দুজন স্মার্ট ব্যক্তি মঞ্চে উঠলেন। তাদের স্ত্রীরা কিভাবে পয়সা খরচ করেন তা নিয়ে নানা কৌতুক শুরু করলেন। এ জাতীয় কৌতুকে সবাই হাসেন এবং বেশ মজা পান। কিন্তু পুরুষদের এসব মোটেও করা উচিত নয়।

আসলে এসব কৌতুকের মাধ্যমে অন্য কিছু ফুটে উঠছে। তারই জানান দিয়েছেন ভ্যানেসা। আপনার বিপুল অর্থ স্ত্রী যেনতেন ভাবে খরচ করে চলেছেন। এতে বোঝা যায় আপনি ধনী। স্ত্রী আজেবাজে খরচ করতে পারেন এমন যথেষ্ট পয়সা আপনার রয়েছে বলেই ঘোষণা দিলেন আপনি।

এতে বোঝা গেলো আপনি এসব অর্থের জোগানদাতা। পরিবারের খেয়াল রাখাটা বেশ ভালো বিষয়। আপনি স্ত্রীর যথেষ্ট খোঁজ করেন। উপায় এমনটা হলে আপনিই জানেন আসলে কিভাবে স্ত্রীর খবর নেন।

এসব কথার মাধ্যমে হয়তো আপনার অজ্ঞাতে আরো কিছু বিষয় বেরিয়ে আসে। যেগুলো মোটেই শোভন দেখায়। যেমন-

১. আপনার স্ত্রী অর্থ উপার্জনের যোগ্য নন। তিনি শুধু খরচ করেন।

২. কিংবা স্ত্রী যা আয় করেন তা কোনো গুরুত্ব রাখে না।

৩. স্ত্রী বোঝেন না অর্থ কি এবং একে কিভাবে খরচ করতে হয়?

৪. আপনি যথেষ্ট বুদ্ধিমত্তা ও যোগ্যতার প্রয়োগে অর্থ কামাই করেন। কিন্তু আপনার স্ত্রী বোকা এক নারী।

৫. অর্থ খরচের বিষয় আপনাদের মধ্যে ভালো বোঝাপড়া নেই।

৬. এগুলো আপনার পয়সা। এসব খরচের অধিকার স্ত্রীর নেই।

হয়তো এই কারণ গুলোর সবই সত্যি। কিংবা কিছু ভুল। হয়তো দুজনের মাঝে এ নিয়ে কোনো ঝামেলা নেই। কিন্তু যখন অন্যদের এভাবে বলছেন, তখন শেষ অবধি তা ভালো কিছু বোঝায় না। আপনার কাছে যদি এটা সমস্যা হয়ে থাকে, তবে তা সমাধানের চেষ্ট করা উচিত। এভাবে বললে আসলে স্ত্রীকে হেয় করা হয়। তা ছাড়া আপনি যদি সত্যিই এ নিয়ে বিরক্ত থাকেন, তবে স্ত্রী সংসার সামলাতে যা করে যাচ্ছেন তার কোনো মূল্য নেই আপনার কাছে। এখান থেকেই পুরুষদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করছেন নারীদের ওপর।

আটলান্টার ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট এবং জেন্ডার স্টাডিজ প্রফেসর অ্যালিসা রে বলেন, এ ধরনের কৌতুকের মাধ্যমে বোঝা হয় যে, নারীরা এমন মানুষ যাদের পেছনে অর্থ ব্যয় করতে হয়। যখন বলা হচ্ছে 'আমার স্ত্রী আমার পয়সা খরচ করে', তখন বোঝানো হয় নারীরা ভঙুর এবং তাদের দেখে রাখতে হবে। এ ধরনের কথায় কেবল নারীরাই যে ক্ষতিগ্রস্ত হন তা নয়। গোটা পরিবারে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। এখানে পুরুষদের একমাত্র জোগানদাতা হিসাবে প্রকাশ করা হয়। পরিবারের সবাইকে বোঝানো হয় পুরুষের ক্ষমতার কথা। বোঝানো হয়, পুরুষ হতে হবে। নয়তো ব্যর্থতা নিশ্চিত। এ ধরনের বক্তব্য বাড়ির মেয়েটি ভেঙে পড়তে পারে।

টুইটারে অনেকে লিখেছেন, স্ত্রীকে নিয়ে স্বামী হালকা ধাঁচের কৌতুক বলে মনে করা হয়। কিন্তু গোটা বিষয়টি নারীকে চূড়ান্ত ভাবে হেয় করে। এর মেয়েদের প্রতি মাধ্যমে ছেলেদের বাজে ধারণার সৃষ্টি হয়।

লিঙ্গ বৈষম্য সৃষ্টি করা এসব কৌতুক বহুকাল ধরে প্রচলিত রয়েছে। বর্ণবাদের মতোই অপরাধ এটি। বর্ণবাদ আধুনিক সমাজ ব্যবস্থার এক নিষিদ্ধ অংশ। কাজেই এ ধরনের কৌতুকও নিষিদ্ধ গণ্য করা যেতে পারে। তা ছাড়া নারীদের নিয়ে কৌতুক হতে পারে এমন মানসিকতা তৈরি হয়ে গেছে নারীদেরও।

যারা এসব বলেন তারা আত্মপক্ষ সমর্থন করে বলতেই পারেন, এটা কেবলই কৌতুক। যখন বলি তখন আমার স্ত্রীও হাসেন। কিন্তু মুদ্রার অপর পিঠে চোখ দেন। নারীরাও শ্রম ঢেলে যা কামাচ্ছেন তাও কিন্তু খরচ করছেন স্বামী। এটা সংসার চালানো, সন্তান লালন-পালনসহ অনেক কাজই হতে পারে। কিন্তু যেহেতু তা পয়সা হয়ে আসে না, তাই বিবেচনার বাইরে থাকে।

আসলে অর্থ কিভাবে খরচ করা হবে তা নির্ভর করে স্বামী-স্ত্রীর ব্যক্তিগত বা পারস্পরিক বোঝাপড়ার ওপর। এটাই তাদের জন্য ভালো। কারো বিষয় নিয়ে অপরের বলা উচিত নয়। নারীরা কৌতুকের পণ্য নন। পুরুষ হিসাবে আপনি আরো ভালো মানের কিছু উপস্থাপন করতে পারেন।

মন্তব্যসমূহ